হাম (Measles) এ টু জেড…..
বর্তমানে দেশে হাম (Measles) নিয়ে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে তাই, সচেতনতার জন্য চলুন জেনে আসি, হাম (Measles) কি?
হাম হলে কি কি লক্ষণ দেখা দেয়? কাদের বেশি? টিকা কখন দিতে হয়? সরকারি বা বেসরকারী টিকা কিভাবে দেয়?
হাম হলে কিভাবে বুঝবো? হাম হলে করণীয় কি? ভিটামিন-এ ক্যাপসুলের ডোজ?
হাম হলে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল এর কাজ কি? ইত্যাদি সব প্রশ্নের উত্তর জানবো আজ……
প্রথমেই আসি হাম (Measles) কী?
হাম বা Measles একটি Virus জনিত অত্যন্ত সংক্রামক (Highly Contagious)রোগ যা Measles Virus দিয়ে হয়।
২০২৩ সালের পর আবারও ২০২৬ এ হাম এর প্রাদুর্ভাব ব্যাপকভাবে দেখা দিচ্ছে।
তবে এটি টিকা নিয়ে প্রায় সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ (Prevent) করা সম্ভব।
এছাড়াও হাম হয়ে গেলে সঠিকভাবে যত্ন ও সাপোর্টিভ চিকিৎসায় রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়।
হাম (Measles) , Highly Contagious বা অনেক বেশি সংক্রামক এবং অনেকটা করোনা ভাইরাসের মতো….
আক্রান্ত ব্যাক্তির হাঁচি-কাশি , থুথু, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায়, একই রুমে থাকা বা রোগীর সংস্পর্শ থাকলে অন্যদের রোগটি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
আক্রান্ত রোগী মাস্ক ব্যবহার করলে কম ছড়ায় যাদের টিকা নেয়া নেই তাদের মধ্যে বেশি ছড়িয়ে পড়ে।
লক্ষণ বা Symptoms :
- যেহেতু Virus দিয়ে হয় তাই High grade Fever থাকবে। মানে অনেক বেশি জ্বর থাকবে (১০২ থেকে ১০৪/১০৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট )
- সর্দি বা নাক দিয়ে পানি পড়া (Runny nose/ Coryza)
- অনেক বেশি শুষ্ক কাশি….(Persistant Dry Cough)
- চোখ লাল হয়ে যাওয়া (Conjuctivitis / Red eye) এবং আলোর দিকে তাকাতে কষ্ট হওয়া।
প্রাথমিকভাবে উপরে লক্ষণগুলো দেখা দেয়া……
কয়েকদিন পর ( ৩-৪দিন) মুখের ভিতরে দুই গালে সাদা ফুসকুড়ি ওঠে যাকে Koplik’s spot বলে।

এছাড়াও গা এ , পিঠে, বুকে ছোট ছোট ফুসকুড়ি বা Rash দেখা দেয়।

কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে….
- ৫ বছরের কম বয়সী শিশু।
- MR/MMR টিকা না নেওয়া শিশু
উল্লেখ্য যে সরকারিভাবে ইপিআই (EPI: Expanded Programmed On Immunization)
সিডিউল এর মাধ্যমে ৯ মাস পূর্ণ বয়সে একটি ও ১৫ মাস পূর্ণ বয়সে একটি টিকা দেয়া হয়।
- অপুষ্টিতে ভোগা শিশু ( Marasmus/ Kwashiorkor or PEM : protein Energy malnutrition Baby)
- দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তি বা শিশু।
যেমন, ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত রোগী, কিডনির রোগী বা শিশু, কিডনির বা লিভার ট্রান্সপ্লান্টের রোগী বা শিশু….
Complications বা জটিলতা:
হাম কে সাধারণ সর্দি, জ্বর ভেবে ভুল করা জীবনঘাতীহতে পারে কিছু ক্ষেত্রে।
বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভুগছে এমন শিশু ও প্রতিরক্ষা ক্ষমতা কম এমন শিশুর জন্য হাম ভয়াবহ হতে পারে।
সব রোগী খারাপ হয় না। তবে কিছু রোগীর সিরিয়াস কিছু Complications হতে পারে….যেমন…..
- Severe Pneumonia (তীব্র নিউমোনিয়া ): এতে শ্বাসকষ্ট হয়।
- মস্তিষ্কের প্রদাহ ( Encephalitis ) : এতে শিশুর স্নায়ুবিক ক্ষতি হয়। এমনকি শিশু অন্ধ হয়ে যেতে পারে।
- ডায়রিয়া ও পুষ্টিহীনতা ও হার্ট বা কিডনি ফেইল হতে পারে (শরীরে দ্রুত পানিশূন্যতা হয়ে অপুষ্টি, হার্ট ও কিডনি ফেইলিউরের মতো জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে)
*শ্বাসকষ্ট ও খিঁচুনি হলে অতিদ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা :
মনে রাখতে হবে এটি একটি Viral রোগ। তাই এর কোন নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। সাপোর্টিভ চিকিৎসা ও পুষ্টিকর খাবার
এবং শরীরে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা পূরণ করা অত্যন্ত জরুরী।
*প্রচুর পানি ও তরল খাবার খাওয়াতে হবে (ডাবের পানি, স্যালাইন বা ORS)
*তরল খাবার মানে শুধু পানি নয়। কাঁটায় কাঁটায় ১/২ লিটার পানিতে ORS গুলিয়ে খাওয়াতে হবে।
*ORS এর প্যাকেট গুলানোর সময় ১/২ লিটার পানি নিতে হবে অবশ্যই। পানি কম বা বেশি করা যাবে না।
মনে রাখবেন…স্যালাইন একটি ওষুধ। তাই এর ঘনত্ব কম বেশি করা যাবে না।
- নরমাল ট্যাপের পানি দিয়ে গা মুছে ফ্যানের নিচে বাচ্চাকে রাখলে শরীরের তাপমাত্রা কমে যাবে।
- গা মোছার জন্য কখনোই ঠান্ডা বা ফ্রিজের পানি ব্যবহার করা যাবে না। গা মুছে এসি রুমেও রাখা যাবে না। এতে শরীরের তাপ কমবে না।
*প্রচুর পুষ্টিকর খাবার ও ফলমূল খাওয়াতে হবে
এটি ভাইরাসজনিত রোগ তাই, পুষ্টিকর খাবারের মাধ্যমে শরীরের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাড়াতে হবে
এবং রোগটি শরীর নিজেই সারিয়ে তুলবে।
- জ্বরের জন্য Napa বা Paracetamol দিতে হবে।
বাচ্চা প্রতি কেজি ওজনের জন্য 15mg করে পাবে তিন থেকে চার বেলা….
১ চামুচ Napa syrup এর থাকে 120mg
তাহলে ১৫ kg বাচ্চার জন্য ১৫গুণ ১৫ = ২২৫mg পাবে এক বেলা।
অর্থাৎ ১৫ কেজি ওজনের বাচ্চা প্রতি বেলা ২২৫ mg Napa syrup পাবে।
যেহেতু ১ চামুচ এ ১২০mg থাকে তাই ২ চামুচের একটু কম পাবে ৩/৪ বার বেলা। জ্বরের তীব্রতা অনুযায়ী।
*ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। WHO এর মতে
হাম এ আক্রান্ত রোগী কে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল দিলে অন্ধত্ব ও অন্যান্য Complications থেকে বেঁচে যায়।
শিশু মৃত্যুর হার অনেকটা কমে আসে……
Vitamin A dose…..
<6 months
Day-1
50,000IU
Day-2
50,000IU
6-11months
100,000IU (Day-1)
100,000IU (Day-2)
12 months or Above 12 months
Day-1
200,000 IU
Day-2
200,000 IU
এভাবে দুটি ডোজ।
তবে, Severe case এর ক্ষেত্রে ১৪ দিন পর আরো একটি ডোজ দেয়া যেতে পারে।
বাজারে Retinol Forte capsule নামে পাওয়া যায়।
**আক্রান্ত বাচ্চার জন্য শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া খুবই জরুরী। ***
এছাড়াও
*রোগীকে আইসোলেটেড করে রাখতে হবে যাতে অন্য কেউ তার থেকে আক্রান্ত না হয়। বিশেষ করে অন্য ছোট বাচ্চা থাকলে।
Immunocompromised রোগী যেমন ডায়াবেটিস , কিডনির রোগী ইত্যাদি….
- রোগী কে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে….
একজন আক্রান্ত রোগী থেকে আশেপাশে ১৮ জন সুস্থ মানুষ আক্রান্ত হতে পারে।
এমন কি Rash ওঠার আগেই রোগটি একজনের থেকে অন্যজনে ছড়াতে পারে। এরমানে বিপজ্জনক,
কেননা Rash না ওঠার আগে রোগটিকে সাধারণ সর্দি, কাশি মনে হতে পারে…..
যা করবেন না……
*নিজে ফার্মেসী থেকে বা MBBS ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বা Antibiotics খাওয়াবেন না।
*গুজবে কান দিবেন না।
জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিবেন।*
এটি ভাইরাসজনিত রোগ তাই এর প্রতিকার নেই, প্রতিরোধ ই একমাত্র উপায়……..
হাম প্রতিরোধে সময়মতো টিকা দেয়াই একমাত্র সমাধান…. MR
( (Measles And Rubella) টিকা যা সরকারিভাবে EPI শিডিউল এ দেয়া হয় তা অত্যন্ত কার্যকরী।
শিশুর টিকা নিশ্চিত করুন, সচেতন থাকুন।
MR Vaccine (হাম-রুবেলা টিকা)
১ম ডোজ: ৯ মাস
২য় ডোজ: ১৫ মাস
২ ডোজ টিকা নিলে হাম রোগ ৯৭-৯৯% নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
প্রতিটি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে এই টিকা ফ্রি দেয়া হয়*
টিকা সম্পর্কে তথ্য……
*দুই ধরনের টিকা পাওয়া যায়…
সরকারি MR যা ৯তম ও ১৫তম মাসে অন্যান্য টিকার সাথে ফ্রি দেয়া হয়।
৯ মাসের পূর্বে মায়ের শরীর থেকে হাম প্রতিরোধী এন্টিবডি শিশুকে প্রতিরক্ষা দেয়।
বেসরকারিভাবে…MMR , যদি সরকারি ভাবে টিকা না পেয়ে থাকে তবে….
বেসরকারি এই MMR নিতে হবে তবে ২ টি ডোজের মধ্যে ১ মাসের গ্যাপ থাকতে হবে।
যেদিন ১ম ডোজ নিবেন তার ১ মাস পর দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে।
*যদি কারো ১ম ডোজ নেয়ার পর ২য় ডোজ না নেয়া থাকে তবে যতো দ্রুত সম্ভব ২য় ডোজ নিতে হবে।
সর্বপরি সুস্থ থাকুন। সচেতন থাকুন।
ধন্যবাদ
Dr. Rezbaul Hasan Royal
MBBS (RU), MPH (On course )
MCGP, PGT( Medicine )
DOC (Skin and VD)